আসল বন্ধু - পরিচয় পাবেন যখন বিপদে পড়বেন


আমি ঐ লোকটার সাথে ঘুরছি ফিরছি কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এখানে আসলে অন্য কারো থাকার কথা ছিলো।

সায়ন্তী কফির মগে মুখ ঢাকলো। অল্প কয়েক গাছি চুল ওর কপাল বেয়ে ঝুঁকে পড়েছে, তিরতির করে ওর ঠোঁট কাঁপছে, এই ভরা শীতেও নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমরা ওকে খুব ক্ষেপাতাম, নাকে ঘাম হলে স্বামী সোহাগী হয়। ‘ স্বামী সোহাগী’ শব্দটা মাথায় আসতেই সম্ভবত আমার চোখে মুখে হাসি খেলে গেলো, কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি সায়ন্তীর চোখ ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে।
দিস ইজ নট ফানি লিরা। আমার নিজেকে একটা ডাস্টবিনের মত মনে হয়।
সায়ন্তীর ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলতে চাইলাম, একটু সময় দে, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই বলা হলো না। তবু সায়ন্তী আশ্বস্তবোধ করলো, ওর চোখে মুখে সেই স্বস্তিটুকু ফুটে উঠেছে। আমি মৃদু হাসলাম।

এই ত্রিশের কাছাকাছি সময়টায় এসে সময় গুলোকে কেমন কুয়াশার মত মনে হয় আমাদের। এই আছে, এই মিলিয়ে যাচ্ছে, স্যাঁতস্যাঁতে একটা দুঃখবোধ আমাদের সারাক্ষণ ঘিরে থাকে, অথচ এই বছর পাঁচেক আগেও আমরা খুব হাসতাম। ফুলার রোড ধরে হাঁটতে যেয়ে হাসির দমকে আমাদের হাত থেকে ঝালমুড়ি ছিটকে পড়ে যেতো প্রায় কালচে ধূসর পিচের রাস্তায়। মশলায় মাখামাখি মুড়ি আর চানাচুর দেখে মনে হতো গাঁদা ফুলের পাঁপড়ি ছিঁড়ে ছিটিয়ে দিয়েছে রাস্তায়। কম্পিউটার আর্কিটেকচারের মরা ক্লাসে স্যার লেকচার দেবার সময় সায়ন্তীর ভীষণ ঘুম পেতো, ও এক দিক থেকে হাই তুলতো সেটা চেইন রি একশনের মত ছড়িয়ে পড়তো পুরো ক্লাসে, স্যার আহত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমরা কোন মতে হাসি চাপতাম। পহেলা বৈশাখ কিংবা পহেলা ফাগুনে শাড়ী পরে রাস্তায় হাঁটবার সময় ও আমাদের চারপাশে রামধনুর মতো আনন্দ ছিটিয়ে থাকতো, তখন ও আমাদের ‘ লাইফ হ্যাপেন্ড’ হয়নি।

এখন আমাদের চোখের কোণে লেপ্টে থাকা সুরমার মত কালি, না ঘুমানো রাতের ক্যানভাস হয়ে জানান দিয়ে যায় আমরা ভাল নেই। অথচ আমরা ভেবেছিলাম আমরা খুব সুখী হবো। কম্পিউটার আর্কিটেকচারের অসহায় বিব্রত স্যারের গলায় সায়ন্তী হাসতে হাসতে মালা পড়িয়েছিলো, কিন্তু সংসারটা দু বছর ও টিকলো না।

কফির বিল চুকিয়ে একটা রিকশা ভাড়া করলাম। ঘন্টা চুক্তিতে। ঢাকা শহর টই টই করে ঘুরে বেড়ানো হবে।আমি অফিস কে ফাঁকি দিয়েছি, সায়ন্তী পনেরো দিনের ছুটিতে দেশে এসেছে।
তুই কিন্তু ভাবিস না আমি চেষ্টা করিনি। কিন্তু কোন টান কাজ করছিলো না জানিস। সুর কেটে গেছে তা ভাবিস না, এখানে কোন সুর কখনো ছিলোইনা। কেমন করে এমন ভুল করলাম বল তো?
সায়ন্তী ছটফট করছে। আমার বুকের মধ্যে কেমন হুঁহুঁ করে উঠলো। সায়ন্তীর আবার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এবার পরিবারের পছন্দে, স্টেটসেই বাড়ি, চমৎকার মানুষ। দু দিন কথা বার্তাও বলেছে আমার সঙ্গে। কিন্তু সায়ন্তীর চোখের কোলে দ্বৈরথের বিভ্রান্তি।

মায়া আর অভিমান খুব খারাপ জিনিস, বুঝলি লিরা। লোকটার বিব্রত চোখের মায়ায় পড়ে গেছিলাম। এরপর অভিমান জমে জমে পাহাড় হলো, উনি একটুও বুঝতে পারলেন না। শেষের দিকে কথাবার্তাই কমে গেলো, কিছু জানতে চাইলে বলতেন সবই তো তোমাকে বলি, কিন্তু আমি দেখতাম দুজনের মাঝে এক সমুদ্র দূরত্ব। এত অবহেলা সইতে পারিনি, আমরা কত হাসতে ভালোবাসতাম। ওনার সাথে থেকে থেকে হাসি ভুলে গেলাম। আই হ্যাড টু বি ক্রুয়েল, অনলি টু বি কাইন্ড। আমি চলে আসার আগে ওনাকে একটা কার্ড দিয়েছিলাম বুঝলি। ছোট্ট করে লিখেছিলাম-

‘আপনার সাথে থেকেও যদি আমার একলা লাগে, এর থেকে আর মন খারাপ কেমন করে হয় বলেন তো?’

উনি কিছু বললেন না একদম আর আমার খুব অপমানিত লাগলো। আমি সংসারটা করতে পারলাম না কেন বলতে পারিস?

আমি সায়ন্তীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। কিছু কিছু সময়ে আমাদের কিছু বলতে নেই, শুধু শুনে যেতে হয়। মনের বাষ্প গুলো উড়িয়ে দেয়ার জন্য আমরা একটা মানুষ খুঁজি। যে কোন জাজমেন্টে যাবে না, কথার মাঝখানে নিজের মন্তব্য চাপিয়ে দিবে না, তুমি ভুল করেছো, তোমাকেই পস্তাতে হবে বলবে না। আমরা মাঝে মাঝে এমন মানুষ খুঁজি যে শুধু শুনবে। সপ্তাহ শেষের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলে আমাদের মনে হয় একটু সবুজের মাঝে বসে থাকি, সুনসান নীরব থাকুক, একটু তাজা নিঃশ্বাস নেই। একটু নিরিবিলি ঘরের মত একটা নীরব বন্ধু আমরা খুঁজি মাঝে মাঝে, যার কাছে হয়তো কোন সলুশান থাকবে না, কিন্তু একটু কথা বলে আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচবো। চার্চে যেয়ে কনফেশন করার মত আমরা একটা মানুষ খুঁজি। আমার মনে হলো সায়ন্তী সেই কথা বলার মানুষ খুঁজছিলো।

আমাদের রিকশার চাকা ঘুরে ঘুরে আমাদের ধানমন্ডি নিয়ে এলো। আমরা ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়লাম। সায়ন্তী তখন ও অস্থির। ওর চোখ ঘুরে ঘুরে এক ঝাঁক বেলুনের উপর পড়ছে বারবার। বেলুন ওয়ালা একটু একটু করে সামনে এগুচ্ছে। এরকম রঙ্গীন বেলুন দেখলে আমার একটা মজার স্মৃতি মনে পড়লো। সেবার আমার সার্জারি হয়েছিলো, অনেকদিন ঘর বন্দী, খিটখিটে হয়ে গেছিলাম, সায়ন্তী হাত ভর্তি করে বেলুন নিয়ে আমার বাসায় হাজির। আমি তখন বারান্দায় ছিলাম। দূর থেকে দেখলাম এক অদ্ভুত গোলাপী সি এন জি যার পিছে বড় বড় করে লেখা প্রাইভেট, সেই সি এন জির দরজা ঘেষে কত রঙের বেলুন ঝুলিয়ে ছুটে আমাদের সুনসান গলির বাসাটার নীচে এসে দাঁড়ালো। বকের মত গলা বাড়িয়ে দেখলাম সায়ন্তী এসেছে। আমরা তারপর ছাদে চলে গিয়েছিলাম, এক সাথে বেলুন উড়িয়ে দিয়ে মনে হয়েছিলো পৃথিবীটা কি অদ্ভূত সুন্দর! আমার মন খারাপ গুলো সেদিন মেঘ হয়ে গিয়েছিলো।

সায়ন্তীকে মিনিট পাঁচেক দাঁড়াতে বলে আমি সেই বেলুন ওয়ালার পিছে ছুটলাম। তার ও মিনিট দশেক পরে সাত মসজিদ রোডে কিছু অবাক মানুষ দেখলো, দুই তরুনী হাত ভর্তি করে রঙ্গীন ফুলের মত গ্যাস বেলুন নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ওদের রোদ ভাঙ্গা হাসি মুখের মাঝে ক্যারিয়ার, বৃদ্ধ বাবা মা, সংসার , শিশু কিংবা কোন কিছু নিয়েই কোন চিন্তা ছিলো না।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post