সাতাশ পরিচয় - নতুন লেখা একখানা মনের মত প্রেম কাহিনী


সিঁড়ি দিয়ে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে নীচে নামছিলাম আর মনে মনে আমার ফেইসবুকে খাওয়া সদ্য ক্রাশের কথা ভাবছিলাম।কিছুটা আনমনে থাকায় সিঁড়িতে কারো সাথে ধাক্কা খেলাম।যার সাথে ধাক্কা খেলাম সে নীচ থেকে উপড়ে উঠছিল আর আমি উপর থেকে নীচে নামছিলাম।ধাক্কা খাওয়ার পর পরই আমি হচকচিয়ে উঠে সরি বলতে যাব তার আগেই ছেলেটি(যার সাথে ধাক্কা খেলাম)নিজ থেকে সরি বলে ফেললো।আমি কেবল হা করে তাকিয়েই আছি।একি!আমিকি ভূত দেখছি নাকি?হাউ ক্যান ইট পসিবল!ইটস টোটালি মীরাক্কেল!এইমাত্র ফেইসবুকে খাওয়া আমার ক্রাশ আমার সামনে দাড়ানো!চোখে গোলকধাঁধা লেগে গেল।ছেলেটি আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।আমি ছেলেটির চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলাম।

ছেলেটি হন হন করে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজাতেই নক করলো।দরজা খুলে দিল আমাদের পাশের রুমের আন্টি মানে যাদের সাথে আমরা সাবলেট থাকি।খুব খাতির করে আন্টি ছেলেটাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিল।আমি ঘটনাটা বুঝতে আবারো ফ্ল্যাটে ঢুকলাম।তারপর আন্টির কাছে জানতে পারলাম যে ইনি আন্টির ভাইপুত্র।আন্টির মেয়ে লুনাকে(আমার ক্লাসমেট বন্ধু)গাইড দেয়ার জন্য এসেছেন।লুনা ছাত্রী তেমন ভালনা।বিশেষত ইংলিশে কাঁচা।তাই এস এস সি পরীক্ষার আগে পর্যন্ত লুনার মামাত ভাই ওকে পড়াবে।প্রথমে
ক্রাশকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে ঢিংকাচিকা নাচ দিতে মন চাইলো।কিন্তু নাচ দিতে গিয়ে যদি সিঁড়ি থেকে পড়ে পা ভেঙে যায়,তাই আর দিলাম না।পরক্ষনই আবার মন খারাপ হল এই ভেবে যে,এই ছেলেটা শুধু লুনার মামাত ভাই হল কেন,আমার হতে পারলোনা?তাহলেতো আমাকেও পড়াতো।ইচ্ছে হচ্ছে আম্মুকে গিয়ে বলি যে আম্মু তুমি পাশের বাসার আন্টির আপন বোন হলেনা কেন? কিন্তু মনে আসলেইতো আর সব কথা মুখে বলা যায়না।তাই আম্মুকে একটু ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে আদুরে স্বরে ন্যাকা ন্যাকা ভাব নিয়ে বললাম
-আম্মু,লুনার মামাত ভাই এসেছে ওকে পড়াতে।ইশ!আমারো যদি একটা মামাত ভাই থাকতো!তাহলেতো এস এস সি পরীক্ষার আগে পর্যন্ত আমাকেও গাইড দিতে পারতো।

সাথে সাথে আম্মুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।খুশি খুশি মোড নিয়ে বললো
-তোরওতো মামাত ভাই আছে।সুমনের কথা ভুলে গেলি তুই?ওকে আসতে বলবো?
সাথে সাথে আমি ভয়ে আঁৎকে উঠলাম।ওমাগো!এ দেখি খাল কেটে কুমীর আনতে চাইছি আমি।এই ছেলের জন্য আমি ছয় বছর যাবৎ মামা বাড়ি যাইনা।সেই ক্লাস ফোর থেকে আমার পেছনে লেগেছে।মামা বাড়িতে গেলে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে আমার পিছে পড়ে থাকতো।এমনকি আমরা গ্রামের বাড়িতে থাকাকালীন ওখানেও প্রায়ই চলে অাসতো অামার পিছে ঘুরার জন্য।দাওয়াত না দিলেও চলে অাসত,কেউ ওকে অাসতে না বললেও কেবল অামার পিছনে বেহায়ার মত ঘুরার জন্য চলে অাসতো। এসে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রপোজ করতো আমাকে।আমি যদি জীবনেও মেট্রিক পাশ না করতে পারি তবুও ঐ
সুমইন্যারে আমাদের বাসায় আসতে দেয়া যাবেনা।আম্মার কথায় আমি পুরুই রবি সীমের মত জ্বলে উঠলাম আপন শক্তিতে।ঘষেটি বেগমের মত ভয়ংকর রুপ নিয়ে বললাম
-মা,ভুলেও এই কাজ করা যাবেনা।তুমি কি ভুলে যাচ্ছ যে তোমার পেটে আমার বহু প্রত্যাশিত একটা ছোট্র বোন বেড়ে উঠছে?তুমি যদি আমার আদুরে বোনটাকে পেটে নিয়ে সবসময় ঐ কাইল্যা,দাঁতলা সুমইন্যারে দেখ তাহলে আমার বোনটাওতো ওর মত কালো হবে।

মা আমার কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে আমাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি সেখান থেকে কেটে পড়লাম আস্তে আস্তে।শত হলেও মায়ের ভাইপুত্র।তার দুর্নাম কি মা হজম করতে পারবে!তবুও কেটে পড়ার সময় মিনমিন করে আরেকবার বলে আসলাম
-কি কালোরে বাপ!দুইশো ওয়াটের এনার্জি বাল্প দিয়েও দেখা যায়না ওর মুখখানা।

ইদানিং লুনা সারাক্ষন শুধু আবীর ভাইয়া,আবীর ভাইয়া করে।আমার একদম সহ্য হয়ন্য ব্যাপারটা।প্রচুর হিংসা হয়।কিন্তু তবু কিছু বলতে পারিনা।কারন,ভাইটাতো অার অামার না,লুনার।

লুনাকে প্রতিদিন বিকেলে ওর আবীর ভাইয়া ছাদে বসে চুলে বেনী করে দেয়।আমারো খুব ইচ্ছে করে আবীরের গা ঘেঁষে বসি তারপর ও আমার চুলে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে বেনী করে দিক।কিন্তু বললেই কি আর সব ইচ্ছা পূর্ন হয়! ভাইটাতো আর আমার না,লুনার।
লুনার আবীর ভাইয়া আসায় লুনা খুব ঘন ঘন পড়তে বসে।বসে বলতে বসতে বাধ্য হয়।আর এই কদিনে আম্মুর সাথেও আবীরের মোটামুটি একটা ভাল সম্পর্ক হয়ে গেছে।লুনার এত বেশী পড়ার কারন হচ্ছে ওর আবীর ভাইয়া।লুনার পড়াশুনার এই গতি দেখে মা আমাকে খালি বলে
-পরীক্ষা কি খালি লুনার একা?তোর নেই?পড়তে বসিস না কেন?আমিও ছিঁচকাঁদুনে হয়ে নাক ফুলিয়ে বললাম
-আমাকেতো কেউ পড়তে নিয়ে বসেনা।

আমার কথা শুনে আম্মু কিছুক্ষন কি যেন চিন্তা করলো তারপর বললো
-এক কাজ করলে কেমন হয়রে মা?আবীরকে বলি তোকেও যেন ও মাঝে মাঝে পড়ায়?

হায় হায়!আম্মু বলে কি!আম্মুর কথা শুনেতো আমার চারতলা থেকে ছয়তলার ছাদে লাফ দিতে ইচ্ছে করছে।এ যে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!আমিওতো এমনটাই চাইছিলাম মনে মনে।কিন্তু নিমিষেই আবারো আমার মন খারাপ হয়ে গেলো।ঠোঁট ফুলিয়ে আদুরে গলায় অভিমানের স্বরে আম্মুর গলা জড়িয়ে ধরে বললাম
-কিন্তু আম্মু,উনি যদি আমাকে পড়াতে রাজী না হন!
-কেন হবেনা?
-বুঝনা কেন আম্মু?ভাইটাতো আর আমার না,লুনার।
-আবীরকে আমি বুঝিয়ে বলব সেই সাথে রেহনুমা ভাবীকেও(আবীরের খালাম্মা মানে পাশের রুমের আন্টি।আরো ভাল করে বলতে গেলে লুনার আম্মু)আম্মু আবারো জোর গলায় বলল
-আমরাতো আর এমনে পড়াবনা তোকে।টাকা দিব আবীরকে
আম্মুর মুখে টাকা দেয়ার কথা শুনে আবারো ভেতরে ভেতরে রবির মত আপন শক্তিতে জ্বলে উঠলাম এই ভেবে যে,আমার ক্রাশ কি ফকিন্নি নাকি যে, আমাকে কয়দিন পড়িয়ে টাকা নিবে!আম্মুর কথার প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা হল কিন্তু করতে পারলাম না।সব ইচ্ছাতো আর পূরন হয়না।এই আবীর লুনার মামাত ভাই না হয়ে আমার মামাত ভাইওতো হতে পারত!কিন্তু না।সেটা আল্লাহ হতে দেয়নি।এই কিউট ছেলেটাকে আল্লাহ লুনার মামাত ভাই করেই পাঠালো।
.
আজ হঠাৎ করেই লুনাদের রুমে গিয়ে আঁৎকে উঠলাম আমি।একি!লুনা সালোয়ার কামিজ পড়েছে!কি করে সম্ভব এটা!যে মেয়ে জিন্সের প্যান্ট আর শার্ট ছাড়া কিছু পড়েনা সে হঠাৎ ড্রেস চেঞ্জ করলো!আমি কতক্ষন হা করে থেকে জিজ্ঞাসা করলাম
-কিরে লুনা,তুই এই ড্রেস আপে?
লুনা বিষন্ন মনে নীচ দিকে তাকিয়ে বলল
-আবীর ভাইয়া আমার সব প্যান্ট শার্ট লুকিয়ে ফেলেছে।বলেছে বড় মেয়েদের এসব পড়তে হয়না।থ্রি পিস পড়লেই ভাল লাগে।লুনা কথাটা বলতেই দেখলাম আবীর এদিকে আসছে।আমি তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললাম
-হুম আবীরতো ঠিকই বলেছে।কথাটা বলেই জিভে কামড় দিলাম।লুনা আমার দিকে বিষ্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালো।তারপর আমি জিভে কামড় দিয়ে পরক্ষনই আবার বললাম যে
-না মানে আবীর ভাইয়াতো ঠিকই বলেছে।বড় মেয়েদেরতো থ্রি পিস পরাই
উচিত।লক্ষ করলাম আবীর আমার এই তোতলানো ভাব দেখে আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিল।

আবীর হাসিটা দেয়ার সাথে সাথে অনুভব করলাম যেন আমার ভেতরে ঘূর্নিঝড় মোড়া বইয়ে গেল।তোলপার হয়ে যাচ্ছিলো আমার ভেতরটাতে।ওয়াও!এটা কি হল!আবীর আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে?আসলে জিন্স আর শার্টতো আমিও পড়ি।তবু আবীরকে একটু ইমপ্রেস করতে ওর কথার সাথে একমত পোষন করলাম আর কি!

বিকেলে আমার দুটো জিন্সের প্যান্ট, টপস আর একটা দিয়াশলাই নিয়ে ছাদে বসে আছি আর মাঝে মাঝে নীচের দিকে উঁকিঝুঁকি মারছি।দেখছি আবীর আসছে কিনা।ও এই টাইমে রোজ ছাদে আসে।আবীরকে ছাদে আসতে দেখেই আমি আমার জিন্স আর টপসে আগুন ধরিয়ে দিলাম।আবীর ছাদে এসেই বলল
-আরে,আরে এ কি করছো তুমি?কাপড় পুড়িয়ে ফেলছো কেন?
-আরে ভাইয়া,আর বইলেন না।আমি সব সময় থ্রি পিস পড়ে থাকতে চাই কিন্তু আমার আম্মু চায় আমি যেন শহরের ডিজিটাল মেয়েদের মত প্যান্ট টপস পড়ে থাকি।আপনিই বলুন প্যান্ট,শর্ট টপস,শার্ট এগুলো পড়া বড় মেয়েদের জন্য ভাল?

আবীর আমার কথা শুনে একটা সুন্দর হাসি দিল।তারপর আমার মাথায় হালকা করে হাতটা ছুঁইয়ে দিয়ে বললো
-গুড গার্ল।

কথাটা বলেই আবীর ছাদের এক কর্নারে চলে গেল।আমি মনে মনে বললাম-গুড গার্ল না!আমি হলাম
গিয়ে বজ্জাতের হাড্ডি!আমরা গ্রাম থেকে এসেছি।আব্বু আম্মু আমাকে সব সময় ভদ্র পোশাক পড়ে থাকতে বলে।লুনার থেকে দেখে পরে কান্নাকাটি করে তিনদিন না খেয়ে থেকে আব্বুকে দিয়ে এই ড্রেস কিনিয়েছি।আমার শখের ড্রেসগুলো কেবল তোমাকে ইমপ্রেস করতে পুড়িয়ে ফেললাম।ইশ!প্রেম
ে পড়লে মানুষ কত কিছুই না করে!ড্রেসগুলোর ছাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভীষন কান্না পাচ্ছে।কান্না থামানোর জন্য আবীরের দিকে তাকালাম।ও মুক্তমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।এই কিউট ছেলেটার দিকে তাকালে আমার মনটা অনেক ভাল হয়ে যায়।

আবীরের দিকে হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাকিয়েছিলাম।ওমনি লুনা ছাদে আসলো।আমি ওকে কিছু বলতে যাব তার আগেই ঐ আমাকে ঠোঁটে আঙ্গুল চেঁপে শসসসসস বলে থামিয়ে দিল।আবীর তখনও আনমনে দাড়িয়ে আকাশ দেখছিল।লুনা পা টিপে টিপে আবীরের পেছনে গিয়ে দাড়িয়ে ওর কানের কাছে জোড়ে চিৎকার করে বলে উঠলো
-ভাউউউ।
আবীর একটুও চমকাল না।বরং ঘুরে দাড়িয়ে লুনার কান মলে দিল।আমার এই দৃশ্য দেখে খুব কান্না পেল।হিংসা হচ্ছিল খুব।কিন্তু কান্না পেলেও কিছু করার নেই।কারন ভাইটাতো আর আমার না,লুনার।

একটা সুসংবাদ পেয়ে আজ মনটা খুব ফুরফুরা লাগছে।আম্মু সুসংবাদটা দিল।সংবাদটা হচ্ছে যে,আবীর নাকি আমাকে পড়াতে রাজী হয়েছে। সেই সাথে
রেহনুমা আন্টিও।আবীরের সাথে প্রতিদিন কথা বলতে পারবো,কাছে বসে পড়তে পারবো ভাবতেই মনে অন্যরকম একটা আনন্দ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।আজ বিকেল থেকেই আবীর আমাকে পড়াবে।প্রতিদিন বিকেলে আমাকে আলাদা পড়াবে

প্রতিদিনকার অভ্যাসমত আমি দৈনিক পত্রিকাটা হাতে নিয়েই "আজকের রাশিফল"দেখলাম।আমার রাশিতে আজ সব ভালই লিখা।কিন্তু চোখ আটকে গেল,কন্য রাশির ফলে।কন্যা রাশির পুরুষদের নাকি আজ প্রেমের প্রস্তাব পাবার সম্ভাবনা আছে।লুনা বলেছিল ওর আবীর ভাইয়ের নাকি কন্যারাশি।আমিতো আবীরকে ভালবাসি কিন্তু আমিতো ওকে আজ প্রপোজ করার কথা একদমই ভাবছিনা।তাহলেকি আমার আগেই ওকে কেউ প্রপোজ করে ফেলবে?নো!ইটস ইমপসিবল।এটা হতে পারেনা।আবীরকে আমি ভালবাসি।ওকে আমি অন্য কারো হতে দেবনা।আবীর শুধু আমার সম্পত্তি হবে।আর কারোর না।
আচ্ছা,আবীরকে কে প্রপোজ করতে পারে?ওতো বাসার বাহিরে তেমন একটা যায়না।এই শহরেও নতুন এসেছে।কারোর সাথে পরিচয় নেই এখানে ওর।আল কোন মেয়ের সাথেতো বটেই না।আচ্ছা,বাকী থাকলো লুনা।লুনা আবার আবীরকে পছন্দ করে নাতো!হায়রে,তাইলেতো আমি শেষ।কারন আমিতো ভুলি নাই যে, ভাইটাতো আমার না,লুনার।

আমি ফন্দি করে সাড়াদিন লুনার পিছে ঘুর ঘুর করলাম যেন ও আবীরকে প্রপোজ করে ফেলে!আমি ছল করে
করে লুনার সাথে রাতে ঘুমালাম।লুনা অবশ্য আমাকে হাজারটা প্রশ্ন করেছিল,কেন হঠাৎ করে ওর সাথে থাকতে চাইছি,বিশেষ কোন কারন আছে নাকি ব্লাহ ব্লাহ অনেককিছু।আমি শুধু ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম
-বাহরে।তুইতো আমার ফ্রেন্ড।আমি কি তোকে ভালবেসে তোর সাথে থাকতে চাইতে পারিনা?

আমি লুনাকে এতটা ভালবাসি শুনে লুনা খুব খুশি হল।ওর খুশি দেখে মনে মনে খুব হাসি পেল।মনে মনে বললাম,আরে পাগলী আমি তোকে না তোর ভাইকে ভালবেসে তোর সাথে থাকছি রাতে।আজ রাত বারোটা পর্যন্ত কেটে গেলেই আমার চিন্তা শেষ।মানে আবীরের প্রপোজ পাবার দিনটা শেষ।

পেপারে দেখা এই রাশিফল যে ভুয়া সেটা আমি বুঝেছিলাম আরো কয়েকদিন পর যখন আমার রাশিতে লিখা ছিল উত্তরে যাত্রা মঙ্গলজনক কিন্তু সেদিন উত্তরে যাত্রা করে অটো অ্যাকসিডন্টে আমার ডান হাত ভেঙে গিয়েছিল।তবে লুনার সাথে সে রাতে থেকে আমার লাভ হয়েছিল।সারারাত আবীরের ব্যাপারে নানানকিছু বলেছিল লুনা।লুনা যখন আবীরের ব্যাপারে কিছু বলে তখন আমার শুনতে খুব ভাল লাগে।ভাল লাগার মানুষ বলে কথা।

আমার হাত ভাঙাতে আমি মনে মনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।সামনে এস এস সি পরীক্ষা ছিল।কিন্তু প্রথম যেদিন
আবীর আমাকে হসপিটালে দেখতে গেল সেদিন আমার হাত ভাঙার সব দুঃখ কষ্ট যেন বঙ্গোপসাগরের পানির সাথে ভেসে গিয়েছিল।আবীর যেতেই মা ওর কাছে নালিশ করল
-দেখ বাবা,তোমার ছাত্রী কিচ্ছু খেতে চাইছেনা।না খেলে হবে বলো?
আবীর তখন আমাক টিচারসুলভ ভাষায় ধমক দিয়ে বললো
-খাচ্ছনা কেন?না খেলে হবে?
কথাটা বলেই আবীর ওর পড়নে থাকা শার্টের হাতাটা কব্জি থেকে একটু উপরে তোলে ওর নিয়ে আসা বিরিয়ানির প্যাকেটটা খোলে আমাকে মুখে তোলে খাইয়ে দিতে লাগলো।মনটাতো খুশিতে নেচে উঠলো এবার।মনে মন বললাম,মিঃ আবীর সাহেব আপনি মুখে তোলে খাইয়ে দিলেতো আমি বিষ খেতেও রাজী।আর ধমক টমক কিছু দেয়া লাগবেনা।আমি বিরিয়ানি খাচ্ছি আর একটু একটু করে আবীরের দিকে তাকাচ্ছি।কি মায়া মায়া মুখ!আবীর আমার পাশে বসে আমাকে খাইয়ে দিচ্ছিল।আমি স্পষ্টভাবে কোন বাঁধা ছারাই ওর গায়ের আর নিঃশ্বাসের মাতোয়ারা গন্ধে একটু একটু করে পাগল হচ্ছিলাম।চোখ বুঁজে আসছিল আমার।তার উপর ওর হাত থেকে যখন খাবার মুখে পুরছিলাম তখন ওর আঙ্গুলগুলো আমার ঠোঁটের সাথে লেগে যাচ্ছিলো।এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি।প্রিয় কারো হাত থেকে খাওয়ার অনুভূতি সত্যি আলাদা।

হাত ভেঙে যে কয়দিন হসপিটালে পরে ছিলাম মায়ের অনুরুধে আবীর আমাকে প্রতিদিন আমাকে
খাওয়াতে যেত।আমিও এরপর থেকে আরো ন্যাকা হয়ে গিয়েছিলাম।খেতেই চাইতাম না একদম।ভাবখানা এমন যে,আবীরের ধমক খেয়ে ভয়ে খাই আমি।আসল ঘটনাটাতো আর আব্বু আম্মু কেউ বুঝতে পারতোনা।

আমি বাসাতে আসার পরও আবীর আমার অনেক কেয়ার করতো।আমার সামনে পরীক্ষা ছিল।আব্বু আম্মুতো একেবারে ভেঙেই পড়েছিল।আব্বু একদিন আবীরের হাত ধরে খুব কান্নাকাটি করলো,আমার মেয়েটার সামনে পরীক্ষা।এখন ওর কি হবে!হ্যান ত্যান নানান কিছু বলে।আবীর আব্বুকে আশ্বস্ত করে বলল
-আপনি চিন্তা করবেন না আংকেল।নিভাকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব আমার।

বাবাকে এই কথা বলে আশ্বস্থ করার র থেকে আবীরের দায়িত্ব যেন আরো বেড়ে গেল।ও আমাক সকাল সকাল ঘুম থেকে ডেকে তোলে।তারপর ছাদে নিয়ে যায়।আমার হাতে ম্যাসাজ করে দেয়।হাতের মধ্যে টানা দেয়।হাত একবার কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করে তারপর আস্তে আস্তে সোজা করে।ফাঁকে ফাঁকে আমাকে অল্প অল্প পড়ায়।আমার দিনগুলো তখন রঙিন থেকেও রঙিনতর হয়ে উঠেছিল।মনে মনে ভাবছিলাম ইশ!হাত কয়েকদিন পর পর ভাঙেনা কেন?হাত না ভাঙলেতো আবীরকে এতটা কাছে পেতাম না।

দেড় মাসের মধ্যে আমি সম্পূর্ন সুস্থ হয়ে উঠলাম।আর এরপর থেকেই আবীরকে শুধু আমি পড়ার টাইমে কাছে পেতাম।আর বাকীসময় আবীর লুনাকে পড়াত।এতদিন কাছে
পেয়ে আবীরের দূরে থাকাটা যেন আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না।আবীর যখন লুনাকে বেশী বেশী পড়াত,তখন আমার খুব কষ্ট হত।ইচ্ছে হত ওর পাশে গিয়ে একটু বসি।আবারো কাছ থেকে ওর শরীর আর নিঃশ্বাসের গন্ধ নেই।জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দিয়ে বারবার আবীরকে দেখতাম।আবীর আমাকে রোজ ঘন্টা দেড়েক পড়াত।এত অল্প সময়ে আমার মন ভরতোনা।লুনাকে সারাদিন আনলিমিটেড পড়াত।আবীরের হঠাৎ দূরে থাকাটা আমাকে ভীষন কষ্ট দিচ্ছিল।

পরীক্ষা উপলক্ষে লুনাকে আবীর শপিং এ নিয়ে গিয়েছিল।আবীর লুনাকে অনেক সুন্দর একটা জামা কিনে দিয়েছে।আমারো কেন জানি ইচ্ছে হচ্ছিলো যে,আবীর আমাকে কিছু একটা দিক,অন্তত একটা কলম।কিন্তু আবীর আমাকে কেন কিছু দিবে?ভাইটাতো আর আমার না,লুনার।

আবীরকে আমার পড়ার সময় ছাড়াও আরো কাছে পাওয়ার সুযোগ হল আমার আম্মুর কোল আলো করে যখন আমাদের ছোট্র প্রিন্সেস এল।আম্মু তখন হসপিটালে।এদিকে রেহনুমা আন্টি অসুস্থ।আমি একা ঘরে ভয় পাই বলে লুনাদের রুমেই থাকতাম বেশী।আসলে ঐসব ভয় টয় কিছুনা।সব আবীরের কাছে কাছে থাকার ধান্ধা।

একদিন আবীর আমাকে পড়াতে পড়াতে বললো
-তোমার বোনটা না দেখতে অনেক কিউট হয়েছে।অনেক সুন্দরী।পিচ্চিট
াকে আমার খুব ভাল লেগেছে।
আমি কি ভেবে যেন আবীরের চোখের দিকে তাকিয়ে
বলে ফেললাম
-আমি দেখতে সুন্দর না ভাইয়া?আমাকে আপনারে ভাল লাগেনা?
কথাটা শুনে আবীর কিছুটা থতমত খেয়ে গেল।আমতা আমতা করে আমাকে একটা ধমক দিয়ে বলল
-পড়ায় মন দাও।পরীক্ষার আর কয়েকদিন বাকী
মাত্র।আমি আর কথা বাড়ালাম না।কেবল মনে হল এভাবে না বলে ডিরেক্ট প্রপোজ করাটাই ব্যাটার হবে।কিন্তু এত সাহস আমি পাব কোথা থেকে?আবীর আমার থেকে সাত আট বছরের বড় হবে।আর আমি একটা টিনেজ মেয়ে।

পড়ার সময় নানান ছলে আমি আবীরকে বুঝাতে চাই যে আমি ওকে ভালবাসি।কিন্তু সে এসব না বুঝার ভান করে থাকে।আমার পরীক্ষার আর মাত্র পনেরোদিন বাকী।শুনেছি লুনার ইংরেজি পরীক্ষার পরই আবীর চলে যাবে।খবরটা শুনার পর বাথরুমে টেপ ছেড়ে দিয়ে অনেক কান্নাকাটি করেছি।তবুও ভেতরের হাহাকারটা দূর হচ্ছিল না।আবীর চলে গেলে প্রচুর কষ্ট হবে।ওর চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই আমার অন্তরে হাহুতাশ শুরু হয়ে যায়।অামি স্পষ্টই বুঝতে পারছি যে,অামার অস্তিত্বে এখন অামার বাস নেই।অামার অস্তিত্ব যেন এখন অাবীরের দখলে।অামার অস্তিত্বে অাবীর বাস করে।ও না থাকলেই যেন অামি অস্তিত্বহীন হয়ে যাব।হুম,এটাই সত্যি যে অামার অস্তিত্বে এখন অামি ছাড়াও অন্য কেউ থাকে।

সামনে পরীক্ষা তাই পড়ায় মন বসাতে চেস্টা করলাম।এর মাঝেই আবীরকে একদিন ডিরেক্ট মুখ ফসকে বলেই ফেললাম যে,আবীর ভাইয়া,আপনি চলে গেলে খুব মিস করব।আবীর ভাইয়া আমার কথাটা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
-আমিও তোমাদের খুব মিস করব।

আমাদের প্রথম পরীক্ষার দিন লুনাকে আবীর নিয়ে যাচ্ছিল।ওরা রিক্সাতে যাবে।আমারো খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আবীরের পাশে বসে যেতে।কিন্তু আমাকে আব্বু নিয়ে যাবে।
আব্বু আমাকে বাইকে করে আবীরদের রিক্সাটা ক্রস করে নিয়ে গেল।লুনা কি সুন্দর করে আবীরের পাশে বসে আছে।আমি আবারো
অনুশোচনা করলাম এই ভেবে যে লুনা যেভাবে আবীরের সাথে রিক্সা করে যাচ্ছে আমি কেন যেতে পারলাম না?হুম,এই জন্যই পারিনি কারন ভাইটাতো আমার না,লুনার।

আমি পরীক্ষার হলে একটু আশ্চর্য হলাম এই দেখে যে,আবীর আমার পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুক্ষন আগে আমার হাতে একটা সেইরকম কলম ধরিয়ে দিয়ে বললো
-তোমাকে বড়কিছু দিতে পারলাম না পাছে তোমার বাবা কিছু মনে করে যদি!এই কলমটা ধর।তুমি আমার ছাত্রী।তোমাকেতো কিছু দিতেই হয়।

কলমটা পেয়ে খুব ভাল লেগেছিল কিন্তু লাস্টে ঐ কথাটা না বললেই কি হতনা যে আমি ওর ছাত্রী বলেই কলমটা দিল!এই কথাটা না বললেতো আমি ভেবে নিতে পারতাম যে আমার প্রিয় একজন আমাকে কলমটা দিয়েছে।এখনতো খালি স্যার স্যার মনে হচ্ছে।ধূর!আবিইর্যা হাবলুটার মধ্যে কোন রোমান্সের বালাই-ই নাই।ওর মন বলতে মনে হয় কিচ্ছু নাই।অন্য কোন ছেলে হলে এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝে যেত যে,আমি তাকে পছন্দ করি।

আমাদের ইংরেজি পরীক্ষা কাল শেষ।আবীর আজ চলে যাচ্ছে।সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবীর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নীচে নেমে গেল।আমি আর লুনা এগিয়ে দিতে এলাম ওকে।আবীর একটু আমতা আমতা করে লুনার সামনেই আমাকে বললো
-তোমার হাতটা দেখি।
লুনা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।আমি ভয়ে ভয়ে কেঁপে কেঁপে হাতটা
এগিয়ে দিলাম আবীরের দিকে।আবীর আমার হাতটা টেনে নিয়ে হাতে একটা ফোন নাম্বার লিখে দিতে দিতে বললো
-আমার কিন্তু গ্রামেই স্যাটেল হওয়ার ইচ্ছে।অন্যের চাকরী আমি করবনা।নিজেই একটা বিজনেস করার ইচ্ছে আছে।।গ্রামে থাকতে পারবেতো আমার সাথে?
আমার যেন আবীরের কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছেনা।চোখে মুখে আমার আনন্দের লাভা ফুঁটে উঠলো।কোনকিছু না ভেবেই পিচ্চি বাচ্চাদের মত একটা লাফ দিয়ে বলে উঠলাম
-অবশ্যই পারব।কেন পারবনা?আমরাতো আগে গ্রামেই থাকতাম।

আমার আনন্দ দেখ আবীর আমার কপালে চলে আসা চুলগুলো কানের কাছে গুঁজে দিতে দিতে মুচকি হাসি দিয়ে বললো
-পাগলী একটা।মন দিয়ে পরীক্ষাগুলো দিও।লুনা এখনো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।ওর চোখে হাজারো প্রশ্ন।আবীর এবার লুনার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ওকে মন দিয়ে পড়ার ও ভালভাবে চলার উপদেশ দিচ্ছে।আজ অবশ্য এ দৃশ্য দেখে আমার একটুও হিংসা হচ্ছেনা।আজ কেবল এই কথাটাই মনে হচ্ছে যে,ভাইটা লুনার হলেও,বরটাতো আমারই হবে ।

(ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন)
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post